বাংলাদেশ শুটিংয়ে অন্ধকার অধ্যায়: যৌন হয়রানি অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ ফেডারেশন
দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী খেলা শুটিং। ১৯৯০ সালের কমনওয়েলথ গেমসে সাফল্যের মাধ্যমে যে খেলা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পরিচয় গড়ে দিয়েছিল, সেই শুটিংই আজ ভয়াবহ বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে। যৌন হয়রানির অভিযোগ, প্রশাসনিক নীরবতা এবং দায় এড়ানোর সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে দেশের ক্রীড়া প্রশাসনের ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।
শুটিংয়ের গৌরবময় অতীত থেকে বর্তমান সংকট
বাংলাদেশের শুটিং ইতিহাস মানেই এক সময় সাহস, শৃঙ্খলা ও আন্তর্জাতিক সাফল্যের গল্প। সেই সময়ের শুটাররা শুধু পদক জেতেননি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পথও দেখিয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই গৌরব আজ চাপা পড়ছে নৈতিকতা ও সুশাসনের অভাবে।
বর্তমানে শুটিং ফেডারেশনকে ঘিরে যে অভিযোগ উঠেছে, তা শুধু একটি ব্যক্তিকে নয়—পুরো ব্যবস্থাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
যৌন হয়রানির অভিযোগ ও মানববন্ধন: কী ঘটেছে?
শুটিং ফেডারেশনের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক জি এম হায়দার সাজ্জাদ–এর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনে মানববন্ধন করেছেন দেশের সাবেক নারী ক্রীড়াবিদরা।
অভিযোগগুলো জানানো হয়েছে—
- জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (NSC)
- যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়
❗ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন:
অভিযোগ যখন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন ফেডারেশনের দাবি—তারা কিছুই জানে না—এটা কি গ্রহণযোগ্য?
NSC-এর সিদ্ধান্ত বনাম ফেডারেশনের অবস্থান
যৌন হয়রানির অভিযোগ তদন্তের স্বার্থে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (NSC) জি এম হায়দার সাজ্জাদকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়।
এছাড়া তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে তাকে ১০ বছরের জন্য বহিষ্কারের সুপারিশ করা হয়।
তবুও বাস্তব চিত্র ভিন্ন—
- সাজ্জাদ নিয়মিত ফেডারেশনে আসছেন
- দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন
- কার্যত ক্ষমতার কেন্দ্রেই রয়েছেন
এতেই প্রশ্ন উঠছে—
ফেডারেশন কি NSC-এর নির্দেশ মানছে না?
সাধারণ সম্পাদকের বিতর্কিত বক্তব্য
শুটিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আলেয়া ফেরদৌস দাবি করেছেন—
- তারা কোনো নারী শুটারের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পাননি
- NSC-এর চিঠিও নাকি তাদের হাতে পৌঁছায়নি
- কিছু শুটার মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছেন
তিনি চার পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্যে অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধেই পাল্টা অভিযোগ তোলেন।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়:
👉 যখন NSC-এর চিঠি গণমাধ্যমে প্রকাশিত, তখন ফেডারেশন কিছুই জানে না—এটা কীভাবে সম্ভব?
সংবাদ সম্মেলনে অস্পষ্টতা ও আত্মবিরোধিতা
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠের পরই সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন সাধারণ সম্পাদক।
একপর্যায়ে তিনি বলেন—
“চিঠিতে স্বাক্ষর করেছি, কিন্তু পড়ার সময় পাইনি।”
এই বক্তব্যে ক্রীড়া প্রশাসনের দায়িত্বশীলতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
আরও বিতর্ক তৈরি হয় যখন তিনি সাজ্জাদের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন—
“তিনি কিছু কাগজপত্র বুঝিয়ে দিতে এসেছিলেন।”
নারী শুটার কামরুন নাহার কলির শাস্তি: দ্বিমুখী নীতি?
যেদিন সাজ্জাদকে NSC থেকে সরানো হয়, সেদিনই শুটিং ফেডারেশন শাস্তি দেয় শুটার কামরুন নাহার কলিকে।
অভিযোগ কী?
- কোড অব কন্ডাক্ট ভঙ্গ
- শৃঙ্খলা ভঙ্গ
- ডিসিপ্লিন ভঙ্গ
কিন্তু কোন নিয়ম ভঙ্গ করেছেন—তা স্পষ্ট করতে পারেননি কর্মকর্তারা।
একপর্যায়ে বলা হয়—
“তিনি সকালে প্র্যাকটিস করেন, বিকেলে করেন না। বাসায় থাকতে চান।”
প্রশ্ন:
👉 পরিবার ও মাতৃত্ব কি এখন শাস্তিযোগ্য অপরাধ?
👉 আন্তর্জাতিক পদকজয়ী শুটারের সঙ্গে এই আচরণ কি ন্যায়সঙ্গত?
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা প্রচার’ অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনের আমন্ত্রণপত্রে শুটিং ফেডারেশন দাবি করে—
“পরিকল্পিত, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মানহানিকর তথ্য প্রচার করা হচ্ছে।”
কিন্তু সাংবাদিকরা বারবার প্রমাণ চাইলে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য বা ডকুমেন্ট দেখাতে ব্যর্থ হন ফেডারেশন কর্মকর্তারা।
শুটিং ফেডারেশনে ক্ষমতার অদৃশ্য কেন্দ্র?
ক্রীড়া অঙ্গনে গুঞ্জন—
- সাধারণ সম্পাদক নামমাত্র দায়িত্বে
- প্রকৃত সিদ্ধান্ত আসে অন্য জায়গা থেকে
- ফেডারেশনের সদস্যকে কোচ বানিয়ে বেতন দেওয়া হচ্ছে
এসব প্রশ্নেরও কোনো পরিষ্কার জবাব পাওয়া যায়নি।
কেন এই বিষয়টি জাতীয় ক্রীড়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
🔍 কারণগুলো হলো—
- নারী ক্রীড়াবিদদের নিরাপত্তা
- ক্রীড়াঙ্গনে সুশাসন
- আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি
- স্পোর্টস ফেডারেশনের জবাবদিহি
এই সংকটের সঠিক সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আরও প্রতিভাবান শুটার হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
উপসংহার: নীরবতা নয়, প্রয়োজন স্বচ্ছতা
বাংলাদেশ শুটিং ফেডারেশন এখন একটি নৈতিক ও প্রশাসনিক ক্রান্তিকাল পার করছে।
এই মুহূর্তে প্রয়োজন—
- স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত
- অভিযোগকারীদের সুরক্ষা
- প্রশাসনিক জবাবদিহি
- ক্রীড়াবান্ধব সংস্কার
নচেৎ, শুটিংয়ের গৌরবময় ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।
✅ এই ধরনের খেলার খবর, বিশ্লেষণ ও আপডেট পেতে আমাদের ব্লগে নিয়মিত ভিজিট করুন। 📰✨
খবর এবং ছবি: সংগৃহীত

0 মন্তব্যসমূহ